📙 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের শিশু শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📕 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ১ম শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📙 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ২য় শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📕 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৩য় শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📙 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৪র্থ শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📕 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৫ম শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📙 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৬ষ্ঠ শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📕 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৭ম শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📙 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৮ম শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📕 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ৯ম-১০ম শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন 📙 ২০২২ শিক্ষাবর্ষের ১১শ-১২শ শ্রেণির সকল বই পিডিএফ ভার্সন

পল্লিসাহিত্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এসএসসি বাংলা ১ম সৃজনশীল প্রশ্ন

পল্লিসাহিত্য - মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা ১ম  নবম-দশম শ্রেণি
পল্লিসাহিত্য 
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ 

[লেখক-পরিচিতি : মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১০ই জুলাই ১৮৮৫ সালে পশ্চিম বঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১০ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে বি.এ. অনার্স পাস করেন। ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে ডিপ্লোমা এবং ডি. লিট. লাভের গৌরব অর্জন করেন। তিনি সুদীর্ঘ ত্রিশ বৎসরকাল বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক এবং অধ্যক্ষরূপে নিয়োজিত ছিলেন। অসামান্য প্রতিভাধর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন সুপণ্ডিত ও ভাষাবিদ। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির অধিকারী। প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে দুরূহ ও জটিল সমস্যার যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে তিনি অসামান্য পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, বাংলা সাহিত্যের কথা (দুই খণ্ড) এবং বাংলা ভাষার ব্যাকরণ তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তার অন্যতম কালজয়ী সম্পাদনা গ্রন্থ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান। তিনি আলাওলের ‘পদ্মাবতী বিদ্যাপতি শতক সহ আরও অনেক গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। শিশু পত্রিকা ‘আঙুর' তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া পাঠ্যপুস্তক অনুবাদ এবং নানা মৌলিক রচনায় তিনি তাঁর দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। ১৩ই জুলাই ১৯৬৯ সালে ঢাকায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ জীবনাবসান ঘটে।]

পল্লিগ্রামে শহরের মতো গায়ক, বাদক, নর্তক না থাকলেও তার অভাব নেই। চারদিকে কোকিল, দোয়েল,পাপিয়া প্রভৃতি পাখির কলগান, নদীর কুলকুল ধ্বনি, পাতার মর্মর শব্দ, শ্যামল শস্যের ভঙ্গিময় হিলাদুলা প্রচুর পরিমাণে শহরের অভাব এখানে পূর্ণ করে দিচ্ছে। পল্লির ঘাটে মাঠে, পল্লির আলোবাতাসে, পল্লির প্রত্যেক পরতে পরতে সাহিত্য ছড়িয়ে আছে। কিন্তু বাতাসের মধ্যে বাস করে যেমন আমরা ভুলে যাই বায়ু- সাগরে আমরা ডুবে আছি, তেমনি পাড়াগাঁয়ে থেকে আমাদের মনেই হয় না যে কত বড় সাহিত্য ও সাহিত্যের উপকরণ ছড়িয়ে আছে। শ্রদ্ধেয় ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন, সাহিত্যের কী এক অমূল্য খনি পল্লিজননীর বুকের কোণে লুকিয়ে আছে।

সুদূর পশ্চিমের সাহিত্যরসিক রােমা রােলা পর্যন্ত ময়মনসিংহের মদিনা বিবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। মনসুর বয়াতির মতাে আরও কত পল্লিকবি শহুরে চক্ষুর অগােচরে পল্লিতে আত্মগােপন করে আছেন, কে তাদের সাহিত্যের মজলিসে এসে জগতের সঙ্গে চেনাশােনা করিয়ে দেবে? আজ যদি বাংলাদেশের প্রত্যেক পল্লি থেকে এইসব অজানা অচেনা কবিদের গাথা সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হত, তাহলে দেখা যেত বাংলার মুসলমানও সাহিত্য সম্পদে কত ধনী। কিন্তু হায়! এ কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল কই? আমরা পল্লিগ্রামে বুড়ােবুড়ির মুখে কোনাে ঝিল্লিমুখর সন্ধ্যাকালে যেসব কথা শুনতে শুনতে ছেলেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছি, সেগুলি না কত মনােহর! কত চমকপ্রদ!

আরব্য উপন্যাসের আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ, আলিবাবা ও চল্লিশ দস্যু প্রভৃতির চেয়ে পল্লির উপকথাগুলাের মূল্য কম নয়। আধুনিক শিক্ষার কর্মনাশা স্রোতে সেগুলাে বিস্মৃতির অতল গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। এখনকার শিক্ষিত জননী সন্তানকে আর রাখালের পিঠা গাছের কথা, রাক্ষসপুরীর ঘুমন্ত রাজকন্যার কথা বা পঙ্খিরাজ ঘােড়ার কথা শুনান না, তাদের কাছে বলেন আরব্য উপন্যাসের গল্প কিংবা Lamb's Tales from Shakespeare-এর গল্পের অনুবাদ। ফলে কোনাে সুদূর অতীতের সাক্ষীস্বরূপ এই রূপকথা নষ্ট হয়ে অতীতের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ লােপ করে দিচ্ছে। যদি আজ বাংলার সমস্ত রূপকথা সংগৃহীত হতাে, তবে কোনাে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করে দেখিয়ে দিতে পারতেন যে, বাংলার নিভৃত কোণের কোনাে কোনাে পিতামহী মাতামহীর গল্প ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য প্রান্তে কিংবা ভারত উপমহাদেশের বাইরে সিংহল, সুমাত্রা, যাভা, কম্বােডিয়া প্রভৃতি স্থানে এমনিভাবে প্রচলিত আছে।

হয়তাে এশিয়ার বাইরে ইউরােপখণ্ডে লিথােনিয়া কিংবা ওয়েলসের কোনাে পল্লিরমণী এখনও হুবহু বা কিছু রূপান্তরিতভাবে সেই উপকথাগুলাে তার ছেলেপুলে বা নাতি-পােতাকে শােনাচ্ছে। কে আছে এই উপকথাগুলাে সগ্রহ করে তাদের অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে? ইউরােপ, আমেরিকা দেশে বড় বড় বিদ্বানদের সভা আছে, যাকে বলা হয় Folklore Society। তাদের কাজ হচ্ছে এইসব সগ্রহ করা এবং অন্য সভ্য দেশের উপকথার সঙ্গে সাদৃশ্য নিয়ে বিচার করা। এগুলাে নৃতত্ত্বের মূল্যবান উপকরণ বলে পণ্ডিত সমাজে গৃহীত হয়। শ্রীযুক্ত দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি’ বা ‘ঠাকুরদার থলে যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সমস্ত উপকথা এক জায়গায় জড় করলে বিশ্বকোষের মতাে কয়েক বালামে তার সংকুলান হতাে না।

আমরা Shakespeare-এ পড়েছি রাক্ষসদের বাঁধা বুলি হচ্ছে Fi, Fie, foh, fun! ও smell the blood of a British man- এর সঙ্গে তুলনা করে পল্লির ‘হাউ, মউ, খাউ, মানুষের গন্ধ পাই, এ সাদৃশ্য হলাে কোথা থেকে? তবে কি একদিন ঐ সাদা ইংরেজ ও এই কালাে বাঙালির পূর্ব পুরুষগণ ভাই ভাই রূপে একই তাঁবুর নিচে বাস করত? সে আজ কত দিনের কথা কে জানে? আমরা কথায় কথায় প্রবাদ বাক্য জুড়ে দিই- যেমন দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা নেই’, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’, আপনি বাঁচলে বাপের নাম’, এই রকম আরও কত কী! তারপর ডাকের কথা আছে, খনার বচন আছে। যেমন ধরুন- কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।

প্রবাদ বাক্যে এবং ডাক ও খনার বচনে কত যুগের ভূয়ােদর্শনের পরিপক্ব ফল সঞ্চিত হয়ে আছে, কে তা অস্বীকার করতে পারে? শুধু তাই নয়, জাতির পুরনাে ইতিহাসের অনেক গােপন কথাও এর মধ্যে খুজে পাওয়া যায়। আমরা আজও বলি- “পিঁড়েয় বসে পেঁড়াের খবর।এই প্রবাদ বাক্যটি সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন পাপুয়া বঙ্গের রাজধানী ছিল। কে এই প্রবাদ বাক্য, ডাক, খনার বচনগুলি সগ্রহ করে তাদের চিরকাল জীবন্ত করে রাখবে? তারপর ধরুন, ছড়ার কথা। কথায় কথায় ছেলেমেয়েগুলাে ছড়া কাটতে থাকে। রােদের সময় বৃষ্টি হচ্ছে, অমনি তারা সমস্বরে ঝংকার দিয়ে ওঠে।

রােদ হচ্ছে, পানি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালীর বিয়ে হচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে মনে করুন মায়ের সেই ঘুমপাড়ানী গান, সেই খােকা-খুকির ছড়া। এগুলি সরস প্রাণের জীবন্ত উৎস, কিন্তু আজ দুঃখে দৈন্যে প্রাণে সুখ নেই। ছড়াও ক্রমে ললাকে ভুলে যাচ্ছে। কে ৪ এগুলিকে বইয়ের পাতায় অমর করে রাখবে?

শুধু ছড়া কেন? খেলাধুলার না কত বাঁধা গৎ আছে বা ছিল আমাদের এ দেশে। যখন ফুটবল, ব্যাটবলের নাম কারও জানা ছিল না, তখন কপাটি খেলার খুব ধুম ছিল। সে খেলার সঙ্গে কত না বাধা বুলি ছেলেরা ব্যবহার করত— এক হাত বোল্লা বার হাত শিং উড়ে যায় বোল্লা ধা তিং তিং। বিদেশি খেলার প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে এসব লোপ পাবার উপক্রম হয়েছে। কে এদের বাঁচিয়ে রাখবে? তারপর ধরুন, পল্লিগানের কথা। পল্লিসাহিত্য সম্পদের মধ্যে এই গানগুলি অমূল্য রত্ন বিশেষ। সেই জারি গান, সেই ভাটিয়ালি গান, সেই রাখালি গান, মারফতি গান- গানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার পল্লির ঘাটে, মাঠে ছড়ানাে রয়েছে। তাতে কত প্রেম, কত আনন্দ, কত সৌন্দর্য, কত তত্ত্বজ্ঞান ওতপ্রােতভাবে জড়িয়ে আছে। শহুরে গানের প্রভাবে সেগুলাে এখন বর্বর চাষার গান বলে দ্রসমাজে আর বিকায় না।

কিন্তু মনমাঝি তাের বৈঠা নে রে আমি আর বাইতে পারলাম না। এই গানটির সঙ্গে আপনার শহুরে গানের কোনাে তুলনা হতে পারে? কিন্তু ধারাবাহিকরূপে সেগুলাে সংগ্রহের জন্য কোনাে চেষ্টা হচ্ছে কি? এ পর্যন্ত যা বললাম সেগুলাে হচ্ছে পল্লির প্রাচীন সম্পদ। সাহিত্যের ভাণ্ডারে দান করবার মতাে পল্লির নতুন সম্পদেরও অভাব নেই। আজকাল বাংলাসাহিত্য বলে যে সাহিত্য চলছে, তার পনেরাে আনা হচ্ছে শহুরে সাহিত্য, সাধু ভাষায় বলতে গেলে নাগরিক সাহিত্য। সে সাহিত্যে আছে রাজ-রাজড়ার কথা, বাবু-বিবির কথা, মােটরগাড়ির কথা, বিজলি বাতির কথা, সিনেমা থিয়েটারের কথা, চায়ের বাটিতে ফুঁ দেবার কথা। এইসব কথা নিয়ে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক রাশি রাশি লেখা হচ্ছে। পল্লির গৃহস্থ কৃষকদের, জেলে-মাঝি, মুটে-মজুরের কোনাে কথা তাতে ঠাই নাই।

তাদের সুখ-দুঃখ, তাদের পাপ-পুণ্য, তাদের আশা- আকাঙ্ক্ষার কথায় কজন মাথা ঘামাচ্ছে? আমাদের বিশ্ববরেণ্য কবিসম্রাটও একবার ‘এবার ফিরাও মােরে’ বলে আবার পুরানাে পথে নাগরিক সাহিত্য নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। ধানগাছে তক্তা হয় কিনা, এখন শহুরে লােকেরা এটা জানলেও পাড়াগাঁয়ের জীবন তাদের কাছে এক অজানা রাজ্য। সেটা কারাে কাছে একেবারে পচা জঘন্য, আর কারাে কাছে একেবারে চাঁদের জ্যোত্সা দিয়ে ঘেরা। তারা পল্লির মর্মকথা কী করে জানবেন? কী করেই বা তার মুখচ্ছবিখানি আঁকবেন? আমাদের আজ দরকার হয়েছে শহুরে সাহিত্যের বালাখানার পাশে গেঁয়াে সাহিত্যের জোড়াবাংলা ঘর তুলতে।
আজ অনেকের আত্মা ইট-পাথর ও লােহার কৃত্রিম বাধন থেকে মুক্ত হয়ে মাটির ঘরে মাটির মানুষ হয়ে থাকতে চাচ্ছে। তাদের জন্য আমাদের কিছু গড়াগাঁথার দরকার আছে। ইউরােপ, আমেরিকায় আজ এই Proletariat সাহিত্য ক্রমে আদরের আসন পাচ্ছে, আমাদের দেশেও পাবে। কিন্তু কোথায় সে পল্লির কবি, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যিক, যারা নিখুঁতভাবে এই পল্লির ছবি শহরের চশমা-আঁটা চোখের সামনে ধরতে পারবেন?

এই সমস্ত রূপকথা, পল্লিগাথা, ছড়া প্রভৃতি দেশের আলােবাতাসের মতাে সকলেরই সাধারণ সম্পত্তি। তাতে হিন্দু মুসলমান কোনাে ভেদ নেই। যেরূপ মাতৃস্তন্যে সন্তান মাত্রেরই অধিকার, সেরূপ এই পল্লিসাহিত্যে পল্লিজননীর হিন্দু মুসলমান সকল সন্তানেরই সমান অধিকার।

এক বিরাট পল্লিসাহিত্য বাংলায় ছিল। তার কঙ্কালবিশেষ এখনও কিছু আছে, সময়ের ও রুচির পরিবর্তনে সে অনাদৃত হয়ে ধ্বংসের পথে দাঁড়িয়েছে। নেহাত সেকেলে পাড়াগাঁয়ের লােক ছাড়া সেগুলাের আর কেউ আদর করে না। কিন্তু একদিন ছিল যখন নায়ের দাড়ি-মাঝি থেকে গৃহস্থের বউ-ঝি পর্যন্ত, বালক থেকে বুড়াে পর্যন্ত, আমির থেকে গরিব পর্যন্ত সকলকেই এগুলাে আনন্দ উপদেশ বিলাতাে। যদি পল্লিসাহিত্যের দিকে পল্লিজননীর সন্তানেরা মনােযােগ দেয়, তবেই আমার মনে হয় এরূপ পল্লিসাহিত্য সভার আয়ােজন সার্থক হবে, নচেৎ এ সকল কেবলি ভুয়া, কেবলি ফকিকার।



শব্দার্থ ও টীকা : কলগান- শ্রুতিমধুর ধ্বনি। পরতে পরতে- স্তরে স্তরে। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনবাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক ও সাধক দীনেশচন্দ্র সেন মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরী গ্রামে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে তিনিই সর্বপ্রথম ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' গ্রন্থে বাংলাদেশের লােকসাহিত্যের গৌরব ও মর্যাদা সাহিত্যের দরবারে তুলে ধরেন। তাঁরই সুযােগ্য সম্পাদনায় চন্দ্রকুমার দে কর্তৃক সংগৃহীত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা' এবং পূর্ববঙ্গ গীতিকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। দীনেশচন্দ্র সেনের মৌলিক গ্রন্থগুলাের মধ্যে রামায়ণী কথা, বৃহত্বঙ্গ, বেহুলা, ফুল্লরা, জড়ভরত ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি পরলােকগমন করেন। রােমা রােলাঁ- (Roman Rolland) ফরাসি দেশের কালজয়ী সাহিত্যিক ও দার্শনিক। রােম রােলার জন্ম ২৯ শে জানুয়ারি ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে। জাঁ ক্ৰিস্তফ’ উপন্যাস তাঁর অমূল্য কীর্তি। এ গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে ননাবেল পুরস্কার লাভ করেন। ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৩৯ সালে তার মৃত্যু হয়। মদিনা বিবি- মৈমনসিংহ গীতিকায় অন্তর্ভুক্ত লােকগাথা ‘দেওয়ানা-মদিনা’র নায়িকা।

মনসুর বয়াতি- দেওয়ানা-মদিনা’র লােকগাথার প্রখ্যাত কবি। আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপআরব্য উপন্যাসের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক গল্প ‘আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ। এ গল্পটির ঘটনাস্থল চীন দেশ। আলাউদ্দিন নামের এক সাহসী তরুণ এক চতুর জাদুকরের বিস্ময়কর প্রদীপ লাভ করে। আলাউদ্দিন ছিল গরিব এক দুঃখিনী মায়ের একমাত্র ছেলে। এ প্রদীপে ঘষা দিলেই এক মহাশক্তিধর দৈত্য এসে হাজির হতাে এবং আলাউদ্দিনের আদেশ অনুযায়ী অলৌকিক কাজ করত। এভাবেই এ প্রদীপের বদৌলতে আলাউদ্দিন প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী হয়। মায়ের দুঃখও দূর হয়।

আলিবাবা ও চল্লিশ দস্যু- আরব্য উপন্যাসের অন্যতম বিখ্যাত গল্প। গরিব কাঠুরে আলিবাবা ভাগ্যক্রমে পাহাড়ের গুহায় দস্যুদলের গুপ্ত ধনভাণ্ডারের সন্ধান পায়। সেখান থেকে প্রচুর ধনরত্ন এনে সে বাড়িতে রাখে। দস্যুদল আলিবাবার ওপর প্রতিশােধ নেওয়ার জন্য তার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করে। আলিবাবা তার বুদ্ধিমতী বাদি মর্জিনার সহায়তায় এই দস্যুদলকে কাবু করে।

Lamb's Tales from Shakespeare- বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজি নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটকগুলাে চার্লস ল্যাম্ব সহজ ভাষায় কিশােরদের উপযােগী করে রূপান্তর করেন। সেই গ্রন্থেরই উল্লেখ এখানে করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক- পুরাতত্ত্ববিদ। যিনি প্রাচীন লিপি, মুদ্রা বা ভগ্নাবশেষ থেকে পুরাকালের তথ্য নির্ণয় করেন। Folklore Society- যে সমিতি লােকশিল্প ও গান, উৎসব-অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার উপাদান সগ্রহ করে এবং প্রচারের জন্য নানা কাজ করে থাকে।

এ সমিতি লােকসাহিত্য সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজে নিয়ােজিত। উইলিয়াম থমসফোকলাের কথাটির উদ্ভাবক। ১৮৪৮ সালে সর্বপ্রথম লণ্ডনে এই সমিতি গঠিত হয়। নৃতত্ত্ব (Anthropology)- মানুষের উৎপত্তি ও বিকাশ সংক্রান্ত বিজ্ঞান। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার- প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক ও বাংলা লােকগাথা ও রূপকথার রূপকার দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের জন্ম ১২৮৪ বঙ্গাব্দে, মৃত্যু ১৩৬৩ সনে। তিনি বাংলার নানা অঞ্চল ঘুরে বহু পরিশ্রম করে রূপকথা সগ্রহ করেন। তাঁর রচিত ‘ঠাকুরমার ঝুলি' শিশুদের প্রিয় বই।

প্রবাদবাক্য- দীর্ঘদিন ধরে লােকমুখে প্রচলিত বিশ্বাসযােগ্য কথা বা জনশ্রুতি, যেমন, নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা।
খনা- প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত নারী জ্যোতিষী । বাংলাদেশের জলবায়ু-নির্ভর কৃষিতত্ত্ব বিষয়ে উপদেশমূলক খনার ছড়াগুলাে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে রচিত বলে ধারণা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত বারাসত মহকুমার দেউলি গ্রামে তাঁর নিবাস ছিল বলে জনশ্রুতি আছে।
বালাম-বইয়ের খণ্ড, ইংরেজি Volume। ভূয়ােদর্শন- প্রচুর দেখা ও শােনার মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা। বালাখানা- প্রাসাদ। Proletariat সাহিত্য- অত্যাচারিত শ্রমজীবী দুঃখী মানুষের সাহিত্য। ফক্কিকারফাকিবাজি।

পাঠ-পরিচিতি : ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কিশােরগঞ্জ জেলায় পূর্ব ময়মনসিংহ সাহিত্য সম্মিলনী’র একাদশ অধিবেশনে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সভাপতিত্ব করেন। এ সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে তিনি যে অভিভাষণ দেন, তারই পুনর্লিখিত রূপ এই পল্লিসাহিত্য প্রবন্ধটি। আলােচ্য প্রবন্ধে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলার পল্লিসাহিত্যের বিশেষ কয়েকটি দিক সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। লেখক এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে, একদিন এক বিরাট পল্লিসাহিত্য বাংলাদেশে ছিল, আজ উপযুক্ত গবেষক এবং আগ্রহী সাহিত্যিকদের উদ্যোগ ও চেষ্টায় সেই সম্পদগুলাে সংগ্রহ করা নিতান্ত প্রয়ােজন। বাংলাদেশের লােকসংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং প্রসারের জন্য পল্লিসাহিত্যের বিচিত্র সম্পদ বিশেষ যত্নের সঙ্গে আহরণ করা একান্ত আবশ্যক।

অনুশীলনী
কর্ম-অনুশীলন

১. পল্লিসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদানের তালিকা তৈরি কর।
২. পাঁচটি খনার বচন লেখ।
৩. বর্ষায় পল্লির প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা দাও।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১। আধুনিক শিক্ষার কর্মনাশা স্রোতের অতল গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে কী?
ক. উপকথা
খ. প্রবাদ
গ. ছড়া
ঘ. পল্লিগান

২। কিন্তু হায়! এ কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল কই?- মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এ হতাশা দূর হতে পারে কীভাবে?
ক. স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে
খ. সভা-সমিতিতে যথাযথ উপস্থাপন করে
গ. ফোকলাের সােসাইটি স্থাপন করে
ঘ. জনসাধারণকে সচেতন করে।

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে ৩ সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও :
ষোল চাষে মুলা
তার অর্ধেক তুলা
তার অর্ধেক ধান
বিনা চাষে পান

৩। উদ্দীপকটির ধরন হলো –
ক. প্রবাদ প্রবচন
খ. খনার বচন
গ. ডাকের কথা
ঘ. লােকগাথা

সৃজনশীল প্রশ্ন
এ লেভেল পরীক্ষা শেষে মিতু মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে আসে। গ্রামে তখন পৌষ মেলা বসেছে। মেলায় মিতু বয়াতির কণ্ঠে ‘একটা ছিল সােনার কইন্যা, মেঘবরণ কেশ, ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কইন্যার দেশ’ গানটি শুনে বিমােহিত হয় । সে তার মাকে জিজ্ঞাসা করে - মা এতদিন কেন আমি এ গানগুলাে শুনিনি। এ গানগুলােই তাে বড় আপু খুঁজছে তার থিসিসের জন্য। আমি এবার আপুর জন্য গানগুলাে সংগ্রহ করে নিয়ে যাব।

ক. সরস প্রাণের জীবন্ত উৎস কোন্‌টি?
খ. আধুনিক শিক্ষার কর্মনাশা স্রোত বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
গ. মিতুর এ গানগুলাে না শােনার কারণটি পল্লিসাহিত্য প্রবন্ধের আলােকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকের মিতুই যেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র চাওয়া পল্লি জননীর মনোেযােগী সন্তান - মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।

পছন্দের গদ্য/প্রবন্ধ পড়তে নিচের লিংকের উপর ক্লিক করুন।
গদ্য/প্রবন্ধ
লেখক
এসএসসি বাংলা ১ম পত্র

Post a Comment

1 Comments

  1. it could be better if the answers of creative and multiple choice questions were answered..

    ReplyDelete