ব্রিটিশ সরকারের ভারত শাসন ও ব্রিটিশ শাসন বিরোধী বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ

ব্রিটিশ সরকারের ভারত শাসনঃ

১৮৬২ সালে ভারতের সর্বপ্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং অবসরগ্রহণ করলে লর্ড এলগিন স্বল্পকাল (১৮৬২-৬৩) ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বড় লাটের পদে আসীন হন লর্ড লরেন্স। অনেকের মতে লরেন্সের শাসনকাল (১৮৬৪-৬৯) ছিল লর্ড ক্যানিং এর শাসননীতির পরিপূরক। পরবর্তীতে আরো যারা ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি হয়ে আসেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হলো লর্ড লিটন (১৮৭৬-৮০), লর্ড রিপন (১৮৮০-৮৪), লর্ড হার্ডিঞ্জ (১৯১০-১৬), লর্ড লিনলিথগো (১৯৩৬-৪৩) এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেন (১৯৪৫-৪৭)।
 
একনজরে ব্রিটিশ শাসকদের সংস্কার কার্যক্রমঃ
দ্বৈতশাসন ব্যবস্তার বিলুপ্তি: ওয়ারেন হেস্টিংস
পাঁচশালা ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা: ওয়ারেন হেস্টিংস
দশশালা ভূমি বনোদাবস্ত ব্যবস্থা: লর্ড কর্ণওয়ালিশ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা: লর্ড কর্ণওয়ালিশ
অধীনতা মূলক মিত্রতা নীতি: লর্ড ওয়েলেসলি
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ: লর্ড বেন্টিঙ্ক
বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়ন: লর্ড ডালহৌসী
ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট প্রণয়ন: লর্ড কার্জন
সতীদাহ প্রতা রদ: লর্ড বেন্টিঙ্ক
রেল যোগাযোগের উন্নয়ন: লর্ড হার্ডিঞ্জ
টাকার প্রচলন: লর্ড ক্যানিং
স্বত্ত্ববিলোপ নীতির প্রবর্তন: লর্ড ডালহৌসী
প্রথম আদমশুমারী: লর্ড রিপন
বঙ্গভঙ্গ: লর্ড কার্জন
বঙ্গভঙ্গ রদ: লর্ড হার্ডিঞ্জ
এশিয়াটিক সোসাইটি: ওয়ারেন হেস্টিংস
দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তর: লর্ড হার্ডিঞ্জ

পদের নাম: প্রথম: শেষ
গভর্নর: রর্বাট ক্লাইভ: ওয়ারেন হেস্টিংস
গভর্নর জেনারেল: ওয়ারেন হেস্টিংস: লর্ড ক্যানিং
ভাইসরয়: লর্ড ক্যানিং: লর্ড মাইন্ট ক্যাটেন

ব্রিটিশ শাসন বিরোধী বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহঃ

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহঃ ফকির-সন্ন্যাসীরা হিন্দু-মুসলমান ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটি দল। কোম্পানির সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নবাব মীর কাশিসের আহবানে ফকির-সন্ন্যাসীরা তাঁর পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। ১৭৬০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত ফকির-সন্ন্যাসীদের সশস্ত্র আন্দোলন ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপু, বগুড়া, ময়মনসিংহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ ও পুর্ণিয়া জেলায় স¤প্রসারিত হয়েছিল। ওয়ারেন হিস্টিংস ফকির-সন্ন্যাসীদের দমন করার জন্য কয়েক দফা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ১৮০০ সাল নাগাদ ফকির-সন্ন্যাসীরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।

নীল বিদ্রোহঃ বাংলার কৃসকগণ ১৮৫৯-৬২ সালে ইউরোপীয় নীলকরদের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সকলে একতাবদ্ধ হয়ে নীলচাষ বর্জন করার আন্দোলন গড়ে তোলে, যা নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে নীল চাষ শুরু হয় অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে। নীল চাষ না করলে বা সময়মতো কুঠিতে পরিমাণ মতো নীল গাছ সরবরাহ না করলে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। ১৮৬০ সালের মার্চ মাসে নীল বিদ্রোহ তুঙ্গে ওঠে। সরকার গোটা নীলব্যবস্থা সম্পর্কে তদন্তের জন্য একটি কমিশন (নীল কমিশন) গঠন করে (১৮৬০ সালের মার্চে)। ১৮৯৭ সালে রাসায়নিক পদ্ধতিতে কৃত্রিম নীল প্রস্তুত-প্রণালী আবিস্কৃত হলে নীল চাষ সম্পনূর্ণভাবে লোপ পেতে থাকে। বাংলার নীল বিদ্রোহ ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সংঘবদ্ধ বিদ্রোহাত্মক আন্দোলন।

তিতুমীরের বিদ্রোহঃ উনিশ শতকের গোড়ার দিকে তিতুমীরের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে একটি প্রজা আন্দোলনের সূচনা হয়। তিতুমীরের আসল নাম মীর নিসার আলী। তিনি ১৮২২ সালে হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন। সেখানে ওহাবী আনোদলনের নেতা সৈয়দ আহমদ শহীদের সাথে সাক্ষাৎ ও ওহাবী মতবাদ গ্রহণ করেন। তিতুমীরের আন্দোলন প্রথমে ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তিতুমীর ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে ভরতপুরের জাঠদের অনুকরণে বাঁশের তৈরী একটি সুরক্ষিত কেল্লা নির্মাণ করেন এবং প্রচুর রসদ ও অস্ত্র সংগ্রহ করেন। গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের নির্দেশে সুসংগঠিত ও অস্ত্রশস্ত্রে (কামানসহ) সজ্জিত ইংরেজবাহিনী কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে নারিকেলবাড়িয়ার বাঁশের কেল্লার ওপর আক্রমণ চালায়। ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ অসমসাহসী বীর-বাঙ্গালী যোদ্ধা তিতুমীর যুদ্ধ ক্ষেত্রেই শহীদ হন (১৯ নভেম্বর ১৮৩১)।

সাঁওতাল বিদ্রোহঃ কোম্পানির ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা ও জমিদারী প্রথা আদিবাসী অঞ্চলে চালু হলে সহজ-সরল প্রাণ আদিবাসী জনগোষ্ঠী জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর প্রবঞ্চনার শিকার হয়। ১৮৪৫-৫৫ সালে এই শোষণ-অত্যাচার অীবচার প্রসূত বিক্ষোভ থেকে প্রবল বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়, যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসী অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করে।

কৃষক আন্দোলনঃ ১৯৪০ এর দশকে সংঘটিত তেভাগা বা আধিয়ার আন্দোলন, টঙ্ক আন্দোলন ও নানকার আন্দোলন ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ এবং এ বিদ্রোহ পরিচালিত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গ সংগঠন কৃষক সমিতির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তথা ১৯৪৬ সালে বাংলায় ‘তেভাগা আন্দোলন’ চরম আকার ধারণ করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর রাজশাহীর নাচোল ও নবাবগঞ্জের ইলা মিত্র ও রমেন মিত্রের নেতৃত্বে সাাঁওতাল ও ভাগচাষীদের আন্দোলন পুনরায় শুরু হলেও সরকারের অত্যাচার ও দমননীতি শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলনের যবনিকা ঘটায়।

খিলাফত আন্দোলনঃ ১ম বিশ্ব যুদ্ধে তুরস্কের পতন ঘটলে তুর্কী সাম্রাজ্যের অখণ্ডত ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য ১৯১৯ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন পরিচালিত হয়। ৩১ আগস্ট খিলাফত দিবস পালন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে কামাল আতার্তুক তুরস্কে খিলাফত উঠিয়ে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করলে খিলাফত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

অসহযোগ আন্দোলনঃ মহাত্মা গান্ধী অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের জনক। অসহযোগের মাধ্যমে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে ব্রিটিশ সরকারকে দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য সর্বপ্রকার অসহযোগিতা করাই এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। ১৯২০ সালে কংগ্রেসের এক বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল ‘সত্যাগ্রহ’ বা নিরস্ত্র নীতি’। হিন্দু মুসলিম একতাবদ্ধ হয়ে এ আন্দোলনে যোগ দেয় এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে। পরবর্তীতে আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠলে এবং উত্তেজিত জনতা কর্তৃক আগুন লাগিয়ে ২১ জন পুলিশকে পুড়িয়ে ফেললে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।

স্বাধীনতার পথপরিক্রমায় গৃহিত পদক্ষেপসমূহঃ

ইন্ডিয়া লীগঃ ভারতীয় জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে শিশির কুমার ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলার কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা ইন্ডিয়া লীঘ গড়ে তোলেন।

ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনঃ ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় কর্তৃক ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন বা ভারত সভা স্থাপিত হয়। মধ্যবিত্ত ভিত্তিক এ সংস্থাদের আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল দেশে এক শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা, সর্বভারতীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করা। 
 
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসঃ ব্রিটিশদের সাধ্য নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শাসনকার্যে ব্রিটিশদের সহায়তার লক্ষ্যে ১৮৮৫ সালে ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ গঠিত হয়। ২৮ ডিসেম্বর, ১৮৮৫ সালে বোম্বেতে বাঙালি ব্যরিস্টার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জীর সভাপতিত্বে এর প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মূলত ব্রিটিশদের আগ্রহে শিক্ষিত ভারতীয়দের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কংগ্রেস গড়ে ওঠে। কংগ্রেসের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এর সভাপতি হবেন ভারতীয় কিন্তু সেক্রেটারি জেনারেল হবেন ব্রিটিশ নাগরিক। প্রতিষ্ঠাকালীন এর সেক্রেটারীর পদ গ্রহণ করেন অবসরপ্রাপ্ত সিভিলিয়ান অ্যালান অষ্টাভিয়ান হিউম। তাঁকে কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতার সম্মান দেয়া হয়।

বঙ্গ বিভাগ, বঙ্গ বিভাগ রদ ও প্রতিক্রিয়াঃ 

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে বাংলা গঠিত ছিল। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ভারতের বড়লাটি লর্ড কার্জন এক ঘোষণায় বাংলা প্রদেশকে দু’ভাগে বিভক্ত করেন। এ ঘটনা বঙ্গ বিভাগ বা বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ এবং আসাম নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ। এ নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। অন্যদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয় পশ্চিম বাংলা প্রদেশ যার রাজধানী হয় কোলকাতা। মি বামফিল্ড ফুলারকে নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিযুক্ত করা হয়।

হিন্দুরা বঙ্গবিভাগের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে এবং বিলেতি দ্রব্য বর্জনের ডাক দেয়। এতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বাণিজ্যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে ১২ জিসেম্বর ১৯১১ রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লী দরবারে বঙ্গবিভাগ রদের ঘোষণা দেন। ২০ জানুয়ারী, ১৯১২ তা কার্যকর হয়। বঙ্গবিভাগ রদের পর বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হন লর্ড কারমাইকেল।

বঙ্গবিভাগ প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন ‘আমার সোনার বাংলা’ স্বদেশী গান। বঙ্গবিভাগ রদের আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় ডিসেম্বর-১৯০৬ ঢাকার নবাব সলিমূল্লাহ মুসলিম লীগ গঠন করেন। বঙ্গবিভাগ রদের কারণে পূর্ব বাংলায় একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে।

মুসলিম লীগঃ ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও গোঁড়া হিন্দুরা যখন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করে তখন বাংলার মুসলমানরা তাদের স্বার্থে কথা বলার মতো কোন রাজনৈতিক দল না থাকায় অসহায় বোধ করে। এ অবস্থায় মুসলমান নেতৃবৃন্দ একটি আলাদা রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় ‘নিখিল ভারত মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স’ এ নবাব সলিমূল্লাহ ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাব সমর্থন করেন হাকিম আজমল খান, জাফর আলী খান ও মুহাম্মদ আলী প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দ। এর ফলে ১৯০৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে‘মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে। ১৯০৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর করাচীতে মুসলিম লীগের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

ভারত শাসন আইন-১৯১৯: ১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করেন যার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, হইকমিশনার পদ সৃষ্টি ইত্যাদি।

ভারত শাসন আইন-১৯৩৫: ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে ভারতবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করা হয়।
 
প্রাদেশিক নির্বাচন-১৯৩৭: ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনের পর মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টি কোয়ালিশন সরকার গঠন করে এবং এ. কে. ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রি নিযুক্ত হন। ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা বেশকিছু জনকল্যাণমূলক কাজ সম্পন্ন করেন। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় কৃষি-খাতক আইন প্রণয়ন করেন এবং ঋণসালিশী বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। হক মন্ত্রিসভা মাদ্রাসা বোর্ড পূর্ণগঠন করেন এবং অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন করেন। তাঁর সময়ে নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য ঢাকায় ইডেন গার্লস কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। হক সাহেব চাকুরিতে ৫০ শতাংশ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ করেন এবং হিন্দুদের প্রাধান্য হ্রাসের জন্য কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি আইন সংশোধন করেন।

দ্বিজাতি তত্ত্বঃ দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। দ্বিজাতিতত্ত্ব ঘোষিত হয় ১৯৩৯ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধর্মভিত্তিক ভারতবর্ষ বিভক্তির প্রস্তাবই হল দ্বিজাতিতত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূলকথা হিন্দু-মুসলিম আলাদা জাতি।

লাহোর প্রস্তাবঃ ২৩ মার্চ, ১৯৪০ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের জনসভায় শেরে বাঙলা এ. কে. ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ নিয়ে ‘যুক্তরাষ্ট্র’ গঠনের প্রস্তাবই ছিল লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য। লাহোর প্রস্তাবে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমে ও পূর্বে একাধিক রাষ্ট্রের কথা বলা হলেও ১৯৪৬ সালে মি. জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন।

ক্রীপস মিশনঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভে ভারতবাসীর সহায়তা লাভের জন্য স্যার স্ট্যামফোর্ড ক্রিপসকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভারতবর্ষে প্রেরণ করেন। তিনি ভারতের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে যে কয়টি প্রস্তাব করেন, তা ক্রীপস প্রস্তাব নামে পরিচিত।

‘ভারত ছাড়’ প্রস্তাব গ্রহণঃ ১৯৪২ সালের ৮ আগষ্ট জাতীয় কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়’ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এ প্রস্তাবে বলা হয় যে, ভারতের মঙ্গলের জন্য এবং জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের জন্য ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান অপরিহার্য।
ব্রিটিশ সরকারের ভারত শাসন ও ব্রিটিশ শাসন বিরোধী বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ

ভারত বিভাগ ও আকাঙ্খিত স্বাধীনতা প্রাপ্তিঃ

১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ পাশ হয়। ১৪ আগস্ট করাচীতে পাকিস্তানের হাতে এবং ১৫ আগস্ট দিল্লীতে ভারতীয়দের হাতে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

বাংলার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আন্দোলন ও পথপ্রদর্শকঃ
ওয়াহাবী আন্দোলনঃ তার সংস্কার আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতিনীতি দূর করে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের নির্দেশিত সরল আদর্শে মুসলিম সমাজকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। ওয়াহাবী আন্দোলন ছিল এক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন। ভারতবর্ষে ওয়াহাবী মত ও আদর্শ প্রচারের পথিকৃৎ ছিলেন সৈয়দ আহমদ বেরেলভী।

ফরায়েজী আন্দোলনঃ পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদেরকে কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্য আলোকবর্তিকা হাতে যে সংস্কারক এগিয়ে আসেন তার নাম হাজী শরীয়তউল্লাহ। তিনি চেয়েছিলেন মুসলমানদের মধ্যে দিনে দিনে যেসব অনৈসলামিক রীতিনীতি অনুপ্রবেশ করছে তা দূর করে তাদেরকে ইসলাম ধর্মের মূল অনুশাসনে ফিরিয়ে নেয়া। ফরায়েজী আন্দোলনকে সারা দেশে একটি সুসংবদ্ধ রূপ দেন হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র দুধু মিয়া। তার আসল নাম মুহসীন উদ্দীন আহমদ।
 
ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশনঃ সৈয়দ আমীর আলী মুসলমানদের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের চিন্তাধারার বশবর্তী হয়ে ১৮৭৭ সালে কোলকাতায় ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন। ১৮৮৩ সালে এ সমিতি সর্ব ভারতীয় রূপ পরিগ্রহ করলে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Central National Mohammadan Association.

ব্রাহ্ম সমাজঃ রাজা রামমোহন রায় হিন্দুধর্মের সংস্কারের জন্য যে আন্দোলন শুরু করেন তা থেকে পরে ব্রাহ্ম-সমাজের উৎপত্তি হয়। ১৮২৮ সালে রামমোহন ‘ব্রাহ্ম-সমাজ’ নামে এক নতুন সভা স্থাপন করেন। প্রকৃতপক্ষেে কানো একটি বিশিষ্ট ধর্ম-স¤প্রদায় গঠন করার পরিকল্পনা রামমোহনের ছিল না। ব্রাহ্মসভায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল লোকেরই প্রবেশাধিকার ছিল। ব্রাহ্ম সমাজের মূল আদর্শ একেশ্বরবাদ ও অপৌত্তলিকতাবাদ।

ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন ও ডিরোজিওঃ প্রাচীন ও ক্ষয়িষ্ণু প্রথা তথা ধর্মীয় সংস্কার ও সামাজিক শৃঙ্খল হতে মুক্তির উল্লেখযোগ্য প্রয়াস হিসেবে ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনকে উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। নিন্দা ও প্রশংসা দু-ই ইয়ং বেঙ্গলের সদস্যরা পেয়েছিলেন।

রামকৃষ্ণ মিশনঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন হলো রামকৃষ্ণ মিশন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ছিলেন এ ধর্ম মতের প্রবক্তা। সকল ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম এবং তার মতবাদের মূল কথা ছিল ‘যত মত, তত পথ’। রামকৃষ্ণের জীবদ্দশায় তার মতবাদ তেমন প্রসারিত না হলেও তার শিষ্য স্বাশী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণের তিরোধানের পর সমগ্র ভারত এবং ভারতের বাইরেও প্রচার করেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post